সোমবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬

শীতে কাপছে ওরা


কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ। কথাটার পরিপূর্ণ অর্থ বোঝায় যায় শীত আসলে। শীত আসবে এ কথা চিন্তা করেই আমরা শীতকে ঘায়েল করার জন্য গরম কাপড় কিনে আলমারি ভর্তি করে ফেলি। বাক্স থেকে বের করি দামি দামি বিদেশি সব কম্বল। গায়ে দেওয়া লেপটাকে মেরামত করে মোটা থেকে আরো মোটা করে তুলি শীতে একটু আরাম পাওয়ার আসায়, একটু উষ্ণ থাকার আশার। উন্নত সব মার্কেটে ঘুরেফিরে গরম কাপড় কিনতে বের হই। হাতে মোজা, পায়ে মোজা, মাথায় টুপি তা-ও কেমন যেন শীত মানায় না। তবু ঠাণ্ডা লাগে। অন্যদিকে আরেক দল মানুষ কেমন আছে, কেমন কাটছে তাদের শীত—একবারও কি ভাবি তাদের কথা? এটা সত্য, অনেকেরই একটি বারের জন্যও মনের ভেতর আসে না তাদের জন্য ভাবনা। সহানুভূতি জাগে না হৃদয়ের কোমল মন্দিরে। আমরা বড় স্বার্থপর হয়ে পড়েছি। আমাদের অর্থসম্পদের পরিমাণ যতটা না বাড়ে, তার থেকে শতগুণ বেশি হারে বাড়ে আমার মনের ভেতরের কৃপণতা। অর্থসম্পদ সামর্থ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনটা সংকুচিত হতে থাকে। আমরা হয়ে পড়ি আত্মকেন্দ্রিক। বারবার খুঁজে ফিরি সমমানের লোকদের। টার্গেট নিই আরও বেশি উন্নত উচ্চমানের লোকজনদের সঙ্গে ওঠাবসার। চারতলায় উঠতে কম করে আটটা সিঁড়ির ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আমরা ভুলে যাই, চার তলায় উঠতে এ আটটি ধাপের কোনোটিই কম গুরুত্বপূর্র্ণ নয়। কিন্তু খুব কম মানুষেরই এমন অভ্যাস আছে যে, একটা ধাপ অতিক্রম করে পেছনে ফিরে দেখেন। বেশির ভাগই একটা অতিক্রম করতে না করতেই ওপরে ধাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনের ভেতর উঁচুতে ওঠার লোভনীয় নেশা চরম থেকে চরমে উন্নীত হয়। এটাই যেন স্বাভাবিক। অনেকে দামি গাড়িতে করে রোজ রাতে ফুটপাতের গলি দিয়ে পার্টি হাউস থেকে আনন্দ-ফুর্তি করতে করতে বাড়ি ফেরে। কিন্তু ভুলেও চেয়ে দেখে না, ফুটপাতের পাশ দিয়ে খোলা আসমানের নিচে শুয়ে থাকা সর্বস্বান্ত মানুষগুলোকে। যাদের শরীরে কাপড়ের অপ্রতুলতা, নোংরা জায়গা, খোলা আকাশ, গোল হয়ে শীতের কষ্টে জর্জরিত মানুষগুলোর দিকে ভুলেও তাকায় না অনেকে। দেখতে দেখতে এটা যেন কেমন একটা স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। আমরা ভাবি, ওরা এমন করেই তো এত দিন থাকছে, এখনো আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এটা নিয়ে ভাবার আবার কী হলো। এভাবেই ফুটপাত, বাসস্টপ, রেলস্টেশন, সদরঘাট, হাসপাতালের সামনে এখানে-ওখানে-সেখানে কত না মানুষ শীতের সঙ্গে যুদ্ধে দিনের পর দিন পরাজিত হয়ে আসছে। যাদের জয়-পরাজয় নিয়ে কখনো কোনো মিছিল-মিটিং-সমাবেশ হয় না। যাদের বাঁচা-মরার খবর বাসি-পচা ময়লা-আবর্জনা আর পচা কলার খোসার সঙ্গে মিশে যায়। আর এদিকে কত মানুষ বিএমডব্লিউ গাড়িতে চড়ে, এসি রুমে ঘুমায় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে করতে ঘুমায়। আসুন আমরা সবাই মনটাকে একটু নরম করে আর্তমানবতার সেবার নিজেকে নিয়োজিত করি। নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা মানবতাকে বাইরে বের করে আনি। যে মুখগুলো না হাসতে হাসতে হাসির কথা ভুলেই গেছে। যাদের মুখ নীরবে কাঁদে হাসি হারানোর বেদনায়, সেই মুখগুলোতে হাসি ফোটাই। আপনার পড়ে থাকা একটা শীতের কাপড় কিন্তু একটা মানুষের শীতকালটাকেই আরামের করে দিতে পারবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Live Cricket